সর্দি-কাশিতে ভিটামিন সি- জাদুকরী ওষুধ নাকি শুধুই মানসিক সান্ত্বনা? (Science Explained)
মনে পড়ে সেই ছোটবেলার কথা? শীতকাল এলেই মা’য়ের জোরাজুরি, "একটা করে কমলা খা, সর্দি লাগবে না।" কিংবা অফিসে সিনিয়র স্যার-এর উপদেশ, "ভাই, একটু সিভিট খেয়ে নাও, ঠাণ্ডা কাশি সেরে যাবে।" আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বিশ্বাসটা মেনে এসেছি। ভিটামিন সি আমাদের সর্দি-কাশির ফাস্ট-এইড। কিন্তু কী বলছে বিজ্ঞান? আসলেই কি এই ম্যাজিকাল পিল বা কমলার রসই আমাদের রক্ষাকর্তা? আমারও একবার ভীষণ জ্বর-সর্দি-কাশি হয়েছিল। তখন একটা বন্ধু এসে হাজির হয়েছিল এক বোতল ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট নিয়ে। বলল, "দুই-তিনদিনে ধপাস করে সেরে যাবে।" আমি তখন ভাবলাম, "এটা তো খুব সিম্পল সল্যুশন!" কিন্তু ফল কি হয়েছিল জানেন? সর্দি-কাশি তার নিজের স্পিডেই সেরেছিল, ঠিক এক সপ্তাহ পরে। ওই অতিরিক্ত ভিটামিন সি-র কোনো জাদুই আমি দেখতে পাইনি। বরং পরে গুগল বাবাকে জিজ্ঞেস করে একটু রিসার্চ করলাম। আরে বাবা! জানলাম এক অদ্ভুত সত্যি। এই পুরো কনসেপ্টটার পিছনে আছে একজন নোবেল জয়ী বিজ্ঞানীর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস... এবং পরে সেই থিওরিকেই ভুল প্রমাণিত করা হয়। হ্যাঁ, গল্পটা এতটাই মজার। তাহলে কি আমরা জীবনভর একটা ভুল ধারণা পুষে বেড়াচ্ছি? চলুন, আজকের এই প্রবন্ধে আলোচনা করি। নিজে জানি, আরেকটু ডিটেইলে জানার চেষ্টা করি। হয়তো আপনারও আমার মতোই ধারণা বদলে যাবে।
"হ্যাঁ...চ্চু!"
ঠিক এই শব্দটা শোনার সাথে সাথেই আমাদের বাসা-বাড়িতে একটা রেড অ্যালার্ট জারি হয়ে যায়। খেয়াল করেছেন? আপনার মা হয়তো দৌড়ে রান্নাঘর থেকে লেবু কেটে আনেন, বাবা অফিস থেকে ফেরার পথে একগাদা মাল্টা বা কমলা নিয়ে আসেন, আর পাড়ার ফার্মেসির বড় ভাই তো আছেনই—বিনা প্রেসক্রিপশনে এক পাতা ভিটামিন সি চুষে খাওয়ার ট্যাবলেট ধরিয়ে দেওয়ার জন্য।
সবার মুখে একটাই কথা—"বেশি করে ভিটামিন সি খা, সর্দি পালাবে!"
আমি নিজেও ছোটবেলা থেকে এই মন্ত্রে বিশ্বাস করে বড় হয়েছি। সর্দি লাগলেই মনে হতো, পৃথিবীর একমাত্র উদ্ধারকারী হলো ওই টক স্বাদের ভিটামিন সি। আমি লেবুর শরবত খেতাম, টক দই খেতাম, এমনকি পকেটে করে চকোলেটের মতো ভিটামিন সি ট্যাবলেট নিয়ে ঘুরতাম। ভাবতাম, আমি বুঝি আমার ইমিউন সিস্টেমকে বুলেটপ্রুফ বানিয়ে ফেলছি। ভাইরাসের সাধ্য কী আমাকে ছোঁবে!
কিন্তু... একদিন হঠাৎ খটকা লাগল।
আমি তো নিয়ম করে ভিটামিন সি খাচ্ছি। তবুও কেন প্রতি সিজন চেঞ্জের সময় আমার নাক দিয়ে পানি পড়ে? কেন তিন-চার দিন টিস্যু পেপার হাতে নিয়ে ঘুরতেই হয়? যদি ভিটামিন সি আসলেই সর্দির "যম" হতো, তাহলে তো আমার সর্দি হওয়াই উচিত ছিল না! নাকি আমরা কোনো একটা বিশাল ভুল ধারণার মধ্যে বাস করছি? এই প্রশ্নটা আমাকে ঘুমাতে দেয়নি। "নিজে জানুন অন্যকে জানান"—আমাদের ব্লগের এই স্লোগানটা তো শুধু মুখে বলার জন্য নয়, তাই না? সত্যটা খুঁজে বের করা আমার দায়িত্ব। তাই আমি ডুব দিলাম মেডিকেল জার্নাল আর গবেষণার সাগরে। এবং সেখানে যা পেলাম, তা জানার পর আমার পায়ের নিচের মাটি... না সরি, হাতের লেবুটা পড়ে গিয়েছিল! আমরা আসলে এমন একটা মিথ বা ভুল ধারণার পেছনে দৌড়াচ্ছি, যার শুরুটা হয়েছিল একজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর হাত ধরে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। একজন জিনিয়াসও ভুল করতে পারেন, আর সেই ভুলের খেসারত আমরা দিচ্ছি দশকের পর দশক ধরে। আজকের এই ব্লগে আমি আপনাদের সেই অজানা গল্পটা শোনাব। সর্দি-কাশিতে ভিটামিন সি আসলেই কাজ করে, নাকি এটা শুধুই আমাদের মনের সান্ত্বনা—সেই রহস্যের জট খুলব। তবে সাবধান, এই লেখাটি পড়ার পর হয়তো আপনার ফার্মেসিতে যাওয়ার অভ্যাসটা বদলে যেতে পারে!
চলুন, আসল সত্যটা জেনে নিই।
বডি সেকশন (Main Content)
মিথের জন্ম: একজন নোবেলজয়ী এবং একটি বিশাল ভুল
গল্পটা শুরু করি একটু ফ্ল্যাশব্যাক দিয়ে। ১৯৭০ এর দশক। লাইনাস পলিং (Linus Pauling) নামে একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি একবার নয়, দু-দুবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। বুঝতেই পারছেন, হেভিওয়েট লোক। হঠাৎ তিনি একটি বই লিখলেন, নাম—"Vitamin C and the Common Cold"। সেখানে তিনি দাবি করলেন, মানুষ যদি প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে (প্রায় ৩০০০ মিলিগ্রাম!) ভিটামিন সি খায়, তবে সর্দি-কাশি তাকে স্পর্শও করবে না। এমনকি ক্যানসার থেকেও মুক্তি মিলবে।
ব্যাস! পাবলিক তো পাগল হয়ে গেল। যেহেতু একজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী বলেছেন, তাই এটা ভুল হতেই পারে না। রাতারাতি ভিটামিন সি সুপারস্টারে পরিণত হলো। মানুষ ফলের দোকান খালি করে ফেলল। কিন্তু সমস্যা হলো, পলিং সাহেব রসায়নে বস হলেও, চিকিৎসা বিজ্ঞানে তার এই থিওরিটা ছিল ভুল। পরবর্তী ৩০-৪০ বছরে হাজার হাজার গবেষণায় দেখা গেছে—ভিটামিন সি সর্দি প্রতিরোধ (Prevent) করতে পারে না। অর্থাৎ, আপনি সারা বছর ভিটামিন সি খেলেও ভাইরাস আপনার শরীরে ঢুকবে এবং সর্দি লাগবেই। পলিং সাহেবের সেই জাদুকরী থিওরি আসলে টেকে নি, কিন্তু মিথটা আমাদের সমাজে আজও বেঁচে আছে।
ভিটামিন সি আসলে কী করে? (The Real Science)
"তাহলে কি ভিটামিন সি খাওয়া বাদ দেব?" আরে না না! রাগ করবেন না। ভিটামিন সি আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সর্দির ওষুধ হিসেবে নয়। ভিটামিন সি মূলত আমাদের শরীরের বডিগার্ড বা পাহারাদার হিসেবে কাজ করে। এটি আমাদের শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Cells)-কে শক্তিশালী করে, যা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এ ছাড়াও এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
ব্যাপারটা এভাবে ভাবুন: ভিটামিন সি হলো আপনার শরীরের "বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স"। এরা আগে থেকেই বর্ডার পাহারা দেয়। কিন্তু একবার যদি শত্রু (ভাইরাস) বর্ডার পার হয়ে দেশের ভেতর (শরীরে) ঢুকে পড়ে, তখন ভিটামিন সি আর নতুন করে কিছু করতে পারে না। তখন যুদ্ধটা শরীরকেই করতে হয়।তাই সর্দি লাগার আগে থেকেই নিয়মিত ভিটামিন সি খেলে আপনার ইমিউনিটি ভালো থাকে। কিন্তু সর্দি লাগার পরে বালতি বালতি লেবুর রস খেলেও খুব একটা লাভ হয় না।
সর্দি লাগার পর খেলে কি কোনোই লাভ নেই?
লজিক্যালি এবং সায়েন্টিফিক্যালি—খুব সামান্য লাভ আছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ভিটামিন সি খান, তাদের সর্দি লাগলে সেটা অন্যদের চেয়ে ৮% দ্রুত ভালো হয়। সহজ কথায়, সাধারণ মানুষের সর্দি যদি ৭ দিন থাকে, আপনার হয়তো সেটা ৬ দিনে ভালো হবে। মাত্র ১ দিনের ব্যবধান!
এখন আপনিই বলুন, এই ১ দিন কমানোর জন্য কি এত এত সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার দরকার আছে?
দামী প্রস্রাব (Expensive Urine) তত্ত্ব
এটা শুনতে একটু অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু এটাই রূঢ় বাস্তব। ভিটামিন সি হলো Water Soluble বা পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন। এর মানে হলো, আমাদের শরীর এটি জমিয়ে রাখতে পারে না। আপনার শরীরের প্রতিদিন যতটুকু ভিটামিন সি দরকার (একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য মাত্র ৭৫-৯০ মিলিগ্রাম, যা একটা বড় কমলায় বা দুইটা পেয়ারাতেই আছে), শরীর ঠিক ততটুকু গ্রহণ করে। বাকিটা?
বাকিটা আপনার কিডনি ছেঁকে প্রস্রাবের সাথে বের করে দেয়। মানে, আপনি যখন সর্দি লাগার পর ১০০০ মিলিগ্রামের ট্যাবলেট খাচ্ছেন, তখন আপনার শরীর হয়তো ১০০ মিলিগ্রাম নিচ্ছে, আর বাকি ৯০০ মিলিগ্রামই বাথরুমে ফ্লাশ হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তাররা মজা করে একে বলেন—"Making Expensive Urine"। আপনি মূলত আপনার টাকাটা ফ্লাশ করছেন!
প্রাকৃতিক বনাম সাপ্লিমেন্ট: কোনটা সেরা?
আমরা অনেকেই ফলের চেয়ে ট্যাবলেটের ওপর বেশি ভরসা করি। মনে করি, ট্যাবলেটে "পাওয়ার" বেশি। ভুল!
প্রকৃতি সব সময় ল্যাবরেটরির চেয়ে স্মার্ট। আপনি যখন একটা পেয়ারা বা কমলা খান, তখন আপনি শুধু ভিটামিন সি পাচ্ছেন না। সাথে পাচ্ছেন ফাইবার, মিনারেলস এবং আরও অনেক পুষ্টি উপাদান। এগুলো সব মিলেমিশে শরীরে কাজ করে। একে বলে Synergy। অন্যদিকে, ট্যাবলেটে থাকে শুধু অ্যাসকরবিক অ্যাসিড (Ascorbic Acid)। এটি প্রাকৃতিক উৎসের মতো এত কার্যকরভাবে শরীরে শোষিত হয় না। উল্টো, অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট খেলে অ্যাসিডিটি, বুক জ্বালাপোড়া, এমনকি কিডনিতে পাথর (Kidney Stone) হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই ফার্মেসির চকচকে প্যাকেটের চেয়ে ভ্যানে বিক্রি হওয়া ডাঁসা পেয়ারা বা আমলকী অনেক গুণ ভালো।
তাহলে সর্দি লাগলে আসলে কী করব?
যেহেতু ভিটামিন সি কোনো ম্যাজিক পিল নয়, তাই সর্দি লাগলে অস্থির হবেন না। ভাইরাস তার নিজস্ব সময় (৫-৭ দিন) নেবেই। আপনি যা করতে পারেন:
- বিশ্রাম (Rest): শরীরকে ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি দিন।
- হাইড্রেটেড থাকা: প্রচুর পানি, স্যুপ বা ফলের রস খান। (এখানে লেবুর শরবত খেতে পারেন, কারণ হাইড্রেটেড থাকাটা জরুরি, ভিটামিন সি-এর জন্য নয়)।
- গরম ভাপ: নাক বন্ধ থাকলে গরম পানির ভাপ নিন।
এটুকুই। এর বাইরে অ্যান্টিবায়োটিক বা একগাদা ভিটামিন খেয়ে শরীরের ওপর অত্যাচার করবেন না।
মনস্তাত্ত্বিক আরাম (The Placebo Effect)
সবশেষে একটা মানবিক দিক বলি। মা যখন সর্দি লাগলে এক গ্লাস গরম লেবু-পানি বা আদা চা বানিয়ে দেন, তখন সেটা খেয়ে আমাদের ভালো লাগে কেন? বিজ্ঞান বলছে, এর নাম Placebo Effect। মায়ের যত্ন, গরম পানীয়ের আরাম এবং আমাদের ছোটবেলার বিশ্বাস—সব মিলে ব্রেইনকে সিগন্যাল দেয় যে, "আমি সুস্থ হচ্ছি।" এই মানসিক শান্তিটাও কিন্তু সেরে ওঠার জন্য জরুরি।
তাই কেউ যদি লেবু খেয়ে আরাম পায়, তাকে খেতে বারণ করবেন না। কিন্তু তাকে জানিয়ে দিন যে, এটা লেবুর জাদুকরী ক্ষমতা নয়, বরং তার মনের জোর।
সঠিক পদ্ধতি কী? ডোজ এবং সোর্স
এবার আসি প্র্যাক্টিকাল কথায়। আপনার প্রতিদিন কতটা ভিটামিন সি দরকার? National Institutes of Health (NIH) এর মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক ৯০ মিলিগ্রাম এবং মহিলার ৭৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি প্রয়োজন। গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে এটা একটু বেশি। এখন দেখুন একটি মাঝারি সাইজের কমলায়ই আছে প্রায় ৭০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি! একটি কাঁচা লঙ্কায় আছে ১০০ মিলিগ্রামের বেশি! তাহলে? আপনি যদি সাধারণভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার খান – একটু ফল, একটু শাকসবজি – তাহলেই আপনার দৈনিক চাহিদা পূরণ হয়ে যাওয়ার কথা। সাপ্লিমেন্ট কখন নেবেন? যদি আপনার ডাক্তার ডায়াগনোসিস করে বলেন যে আপনার শরীরে ভিটামিন সি-র অভাব আছে, অথবা আপনি এমন কোনো ডায়েট ফলো করেন যেখানে ফলমূল শাকসবজি একদমই কম (যা মোটেও উৎসাহিত করি না), তখনই কেবল সাপ্লিমেন্টের কথা ভাববেন।
আরেকটা বড় সতর্কতা। ভিটামিন সি কিন্তু ওয়াটার সলুবল। শরীরের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশ প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়, এটা সত্যি। কিন্তু আপনি যদি দিনে ২০০০ মিলিগ্রামের বেশি (যাকে Tolerable Upper Intake Level ধরা হয়) গ্রহণ করেন, তাহলে পেটে গ্যাস, বদহজম, ডায়রিয়া,কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারেন। অতিরিক্ত কোনো কিছুরই মূল্য আছে, isn't it?
শেষকথা (Conclusion)
লিখতে লিখতে অনেক কিছু শেয়ার করে ফেললাম। আশা করি, এতক্ষণে আপনার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার। ভিটামিন সি আমাদের শত্রু নয়, পরম বন্ধু। কিন্তু তাকে আমরা এমন এক দেবতার আসনে বসিয়েছি, যা সে ডিজার্ভ করে না। সর্দি-কাশি সারানোর জাদুকরী ক্ষমতা তার নেই। সে শুধু আপনার শরীরের ডিফেন্স সিস্টেমকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে, তাও যদি আপনি সেটা নিয়মিত (সারা বছর) খান। তো, কী বলব এখন? আমাদের প্রিয় ভিটামিন সি-র সম্পর্কে আমাদের ধারণাটা একটু আপডেট করার সময় এসেছে। এটি কোনো ম্যাজিক বুলেট নয়। এটি জাদুর গুঁড়াও নয়। এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান, যার একটি নির্দিষ্ট এবং সীমিত ভূমিকা আছে। আসল ম্যাজিকটা লুকিয়ে আছে সামগ্রিকভাবে একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মধ্যে। পর্যাপ্ত পানি পান করা, রেগুলার এক্সারসাইজ করা, পর্যাপ্ত ঘুমানো, মানসিক Stress কমানো, এবং একটি Balanced Diet খাওয়া – যেখানে থাকবে নানারকম রঙিন ফল ও সবজি। এটাই হলো ইমিউনিটি বুস্ট করার রিয়াল ডিল।
আমার নিজের লেসন লার্ন্ট হয়েছে। এখন সর্দি-কাশি হলে আমি ভিটামিন সি-র বোতলের দিকে না ছুটে গিয়ে, প্রথমে প্রচুর পানি পান করি, গার্গল করি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিই এবং পুষ্টিকর হালকা খাবার খাই। আর হ্যাঁ, মায়ের কথা শুনে একটা কমলা খেয়ে নিই। কারণ, সেটা খেলে মন ভালো হয়ে যায়, মায়ের ভালোবাসাটা শরীরে কাজ করে – এটাও একধরনের থেরাপি! তাই, আজ থেকে সিদ্ধান্ত নিন। কোনো কিছুর উপর অন্ধ বিশ্বাস রাখবেন না। যাচাই করে নিন। Evidence-based information-ই হলো আসল পাওয়ার। আপনার শরীরের সিগনাল বুঝতে শিখুন। সে যা চায়, তা-ই দিন। না চায়, তা জোর করে ঢোকাবেন না।
আজকের এই ব্লগ থেকে আমাদের "Takeaway" কী?
- সর্দি লাগার পর ভিটামিন সি খেয়ে খুব একটা লাভ নেই, বরং সারা বছর অল্প অল্প করে প্রাকৃতিক উৎস (শাক-সবজি, ফল) থেকে ভিটামিন সি খাওয়া উচিত।
- সাপ্লিমেন্ট বা ট্যাবলেটের ওপর নির্ভরশীলতা কমান। ওগুলো শুধুই দামী প্রস্রাব তৈরি করে।
- আমাদের দেশি ফল—আমলকী, পেয়ারা, জাম্বুরা বা কাঁচামরিচ—বিদেশি কমলার চেয়ে অনেক বেশি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ। এবং সস্তা!
"নিজে জানুন অন্যকে জানান"—এই যাত্রায় আমার সঙ্গী হওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমরা অনেকেই না জেনে ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জীবন চালাই। আজ আপনি সত্যটা জানলেন। এখন আপনার দায়িত্ব হলো—আপনার সেই বন্ধুকে থামানো, যে একটু হাঁচি দিলেই ফার্মেসিতে দৌড়ায়। তাকে বলুন, "দোস্ত, টাকাটা ট্যাবলেটে খরচ না করে চল দুইটা পেয়ারা কিনে খাই। শরীরও ভালো থাকবে, পকেটও বাঁচবে!"
সুস্থ থাকুন, লজিক্যাল থাকুন। শরীরকে ভালোবাসুন, তবে অন্ধবিশ্বাসে নয়, সঠিক জ্ঞানে।
কল টু এ্যাকশন (CTA)
আপনার অভিজ্ঞতা কী? আপনি কি কখনো সর্দি লাগার পর টানা ভিটামিন সি খেয়ে দেখেছেন কোনো কাজ হয়নি? নাকি আপনি প্রাকৃতিক টোটকায় বিশ্বাসী? কমেন্ট বক্সে আপনার গল্পটি আমাদের সাথে শেয়ার করুন!
আর এই লেখাটি পড়ে যদি মনে হয় আপনার পরিবারের কারো উপকার হবে, তবে অবশ্যই শেয়ার করুন। ভুল ভাঙাতে সাহায্য করুন। 🧡
এই তথ্যগুলো কি আপনার হয়েছে? আপনার নিজের ভিটামিন সি নিয়ে কোনো এক্সপেরিয়েন্স আছে? নাকি সর্দি-কাশি দূর করার আপনার নিজস্ব কোনো টিপস আছে? নিচে কমেন্ট সেকশনে আমাদের সাথে শেয়ার করুন না! "নিজে জানুন, অন্যকে জানান" – এই চেইনটা চালিয়ে যাওয়া যাক। আর এই পোস্টটি যদি আপনার বন্ধুবান্ধবের কাজে লাগতে পারে বলে মনে হয়, সোশ্যাল মিডিয়াতে তাদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: দিনে ঠিক কতটুকু ভিটামিন সি খাওয়া উচিত?
- উত্তর: একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের জন্য দিনে ৯০ মিলিগ্রাম এবং নারীর জন্য ৭৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি যথেষ্ট। মজার ব্যাপার হলো, মাত্র একটা মাঝারি সাইজের পেয়ারাতেই এর চেয়ে দ্বিগুণ (প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম) ভিটামিন সি থাকে! তাই স্বাভাবিক খাবার খেলে ঘাটতি হওয়ার কথা নয়।
প্রশ্ন ২: অতিরিক্ত ভিটামিন সি খেলে কী ক্ষতি হতে পারে?
- উত্তর: ভিটামিন সি নিরাপদ হলেও, দিনে ২০০০ মিলিগ্রামের বেশি খেলে ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, পেট ব্যথা এবং বুক জ্বালাপোড়া হতে পারে। যারা কিডনি স্টোনের ঝুঁকিতে আছেন, তাদের অতিরিক্ত ভিটামিন সি এড়িয়ে চলা উচিত কারণ এটি অক্সালেট স্টোনের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রশ্ন ৩: কোন খাবারে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন সি থাকে? কমলা নাকি লেবু?
- উত্তর: অবাক হলেও সত্যি, কমলা বা লেবুর চেয়ে আমাদের দেশি আমলকী এবং পেয়ারাতে অনেক বেশি ভিটামিন সি থাকে। এমনকি কাঁচা মরিচেও কমলার চেয়ে বেশি ভিটামিন সি আছে!
প্রশ্ন ৪: রান্না করলে কি ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়?
- উত্তর: হ্যাঁ, একদম ঠিক। ভিটামিন সি তাপের প্রতি খুব সংবেদনশীল (Heat Sensitive)। বেশি আঁচে রান্না করলে বা দীর্ঘক্ষণ ফুটালে সবজির ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়। তাই ভিটামিন সি পেতে কাঁচা ফল বা সালাদ খাওয়া সবচাইতে ভালো।
প্রশ্ন ৫: বাচ্চাদের কি সর্দি লাগলে ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট দেওয়া উচিত?
- উত্তর: ডাক্তার না বললে বাচ্চাদের কখনোই নিজে নিজে সাপ্লিমেন্ট দেওয়া উচিত নয়। বাচ্চাদের কিডনি ছোট এবং সংবেদনশীল। তাদের ফলের রস বা ফল চটকে খাওয়ানোই সবচেয়ে নিরাপদ এবং কার্যকর উপায়।
প্রশ্ন ৬: সর্দি-কাশির প্রথম লক্ষণ দেখলেই কি ভিটামিন সি নেওয়া উচিত?
- উত্তর: বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলছে, এটি বিশেষ কোনো কার্যকরী কৌশল নয়। প্রথম লক্ষণে বিশ্রাম নিন, পানি পান করুন এবং পুষ্টিকর খাবার খান। এটি ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্টের চেয়ে বেশি কার্যকর।
প্রশ্ন ৭: ভিটামিন সি-র সেরা প্রাকৃতিক উৎসগুলো কী কী?
- উত্তর: কমলা, মাল্টা, পাতিলেবু, আঙুরের মতো সাইট্রাস ফল। এর পাশাপাশি পেয়ারা, ক্যাপসিকাম (বেল পেপার), ব্রকলি, স্ট্রবেরি, কিউই এবং এমনকি কাঁচা আমেও ভিটামিন সি-র ভাণ্ডার রয়েছে।
প্রশ্ন ৮ : 'এস্টের-সি' নামক সাপ্লিমেন্টগুলো কি সাধারণ ভিটামিন সি-র চেয়ে ভালো?
- উত্তর: এস্টের-সি একটি পেটেন্ট ফর্মুলেশন যা দাবি করে যে এটি দ্রুত শোষিত হয় এবং পেটের জন্য সহজ। কিছু স্টাডি ইতিবাচক ফল দেখালেও, সামগ্রিকভাবে এটির কার্যকারিতার ব্যাপারে বড় ধরনের কোনো প্রমাণ নেই যে এটি সাধারণ ভিটামিন সি-র চেয়ে সর্দি-কাশি সারাতে বেশি কার্যকর। এটি সাধারণত বেশি দামি হয়।
প্রশ্ন ৯ : বেশি ভিটামিন সি খেলে কি সত্যিই ক্ষতি হয়?
- উত্তর: হ্যাঁ, হতে পারে। দৈনিক ২০০০ মিলিগ্রামের বেশি ডোজ পেটে অস্বস্তি, বমি বমি ভাব, পেট খারাপ এবং ডায়রিয়া তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে অত্যধিক সেবন কিডনিতে পাথর তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়, বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই কিডনির সমস্যা আছে।
প্রশ্ন ১০: শিশুদের জন্য ভিটামিন সি-র ডোজ কতটা নিরাপদ?
- উত্তর: শিশুদের বয়স অনুযায়ী ডোজ ভিন্ন হয় (১-৩ বছর: ১৫ মিলিগ্রাম, ৪-৮ বছর: ২৫ মিলিগ্রাম ইত্যাদি)। শিশুদের ক্ষেত্রে সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার আগে পেডিয়াট্রিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে безопас উপায়। প্রাকৃতিক উৎস থেকেই তাদের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করুন।


কাজীআরিফুল ডট কমে নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url